বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ রোগী চিকিৎসার আওতায় আসেনি
নিজস্ব প্রতিবেদক ডায়াবেটিস ছড়িয়ে পড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বাংলাদেশে এ রোগে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ আক্রান্ত। নগর সুবিধার কারণে শহরের মতো গ্রামেও ডায়াবেটিক রোগী বাড়ছে। প্রতি বছর ২ শতাংশ নতুন রোগী যোগ হচ্ছে। দেশের ৭৫ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেনি। অসচেতনতা, কায়িক পরিশ্রম কম করা ও ফাস্টফুড কালচারসহ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আজ সোমবার বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের প্রাক্কালে গতকাল রোববার ঢাকার বারডেম হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বাডাস) উদ্যোগে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) সভাপতি প্রফেসর এ কে আজাদ খান। উপসি'ত ছিলেন সহসভাপতি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, মেজর জেনারেল (অব:) অধ্যাপক ডা: এ আর খান, মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন, প্রফেসর অ্যামিরেটাস অধ্যাপক হাজেরা মাহতাব, বাডাস ন্যাশনাল কাউন্সিল সদস্য মাহবুবুজ্জামান, বাডাস চিফ কো-অর্ডিনেটর ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, বারডেমের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুন নাহার, বারডেম ডেন্টাল ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা প্রফেসর ডা: অরূপ রতন চৌধুরী।
‘প্রতি আট সেকেন্ডে ডায়াবেটিসে মারা যাচ্ছে একজন। ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হবে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, বিনামূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয়সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন হবে। ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ১৯৮৫ সালে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তিন কোটি থাকলেও বর্তমানে ৩৬ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। গত আড়াই দশকে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১২ গুণ। আগামী ২০ বছরে রোগীর সংখ্যা ৫৫ কোটিতে দাঁড়াবে। উল্লেখ্য, ৮০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগীই উন্নয়নশীল বিশ্বের।
বাডাস আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে আট দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলো হলো ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত, ফাস্টফুডের মোড়কে চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ উল্লেখ করা, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি দেয়ার সময় একক বা যৌথভাবে খেলার মাঠের ব্যবস'া রাখা, রেডিও-টিভিতে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, এলাকাভিত্তিক ওয়ার্কিং ক্লাব ও সুইমিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা, নতুন বসতি গড়ে তোলার অনুমতি দেয়ার আগে পর্যাপ্ত রাস্তা রাখার বিধান করা, হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস'্যশিক্ষার ব্যবস'া করা, ইমামদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো, সচেতনতা সৃষ্টির জন্য মোবাইল ফোন অপাররেটরদের উৎসাহিত করা।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক পোস্টার-লিফলেট বিতরণ, আজ সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় বাডাসের উদ্যোগে মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সকাল ৮ থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, মোহাম্মদপুরে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয়, বেলা ১১টায় বারডেম অডিটোরিয়ামে ডায়াবেটিক রোগী ও বিশেষজ্ঞদের মতবিনিময় ও প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান ও বিকেল ৪টায় মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি উদ্বোধনসহ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং ডায়াবেটিক ওয়েল বিয়িং ফাউন্ডেশন যৌথ উদ্যোগে ১ নভেম্বর থেকে পক্ষকালব্যাপী স্বাস'্যমেলার আয়োজন করেছে বিভিন্ন অফিস, মিডিয়া সেন্টার, বস্তি, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রামে। স্বাস'্যমেলার মূল আয়োজন আজ ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের জাপান- বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে।
ডায়াবেটিস কী : ডায়াবেটিস হলে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজ অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়। ইনসুলিন হচ্ছে অগ্নাশয়ের বিশেষ ধরনের কোষ (বিটা সেল) থেকে তৈরি হওয়া হরমোন যা রক্ত থেকে গ্লুকোজকে কোষে নিয়ে জমা করে। শরীরে ইনসুলিনের উৎপাদন যদি প্রয়োজনের চেয়ে কম হয় অথবা উৎপাদিত ইনসুলিনের কার্যকর ব্যবহার না হয় তখনই গ্লুকোজ কোষে পৌঁছাতে পারে না, শক্তির জোগানও দিতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য দেখা দেয়। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘস'ায়ী রূপ নিলে দেহের স্বাভাবিক বিপাক ব্যাহত হয়।
আক্রান্ত হওয়ার কারণ : ওজনাধিক্য ও মেদবাহুল্য, কায়িক শ্রমের অভাব, উচ্চ শর্করা ও কম আঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, কোনো কোনো আদি জনগোষ্ঠী, পারিবারিক ইতিহাস, কম ওজনের জন্ম নেয়া।
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ : ঘন ঘন প্রস্রাব, স্বল্পসময়ে ওজন হ্রাস, অধিক তৃষ্ণা ও মুখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, অতিশয় দুর্বলভাব, ঘন ঘন রোগ সংক্রমণ, সার্বক্ষণিক ক্ষুধা ও ক্ষত না শুকানো।
ডায়াবেটিসসংক্রান্ত জটিলতা : অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ফলে প্রধানত চার ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এগুলো হলো- হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর সমস্যা (হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট স্ট্রোক), কিডনিজনিত সমস্যা (কিডনির অক্ষমতা ও বৈকল্য হলে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস'াপনেরও প্রয়োজন হয়), স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা (স্নায়ু অসাড় হলে গোটা শরীর অসাড় হয়ে পড়তে পারে। অনেক সময় অঙ্গহানি পর্যন্ত ঘটে) ও চোখের সমস্যা (অন্ধত্ব ও দৃষ্টি বিচ্যুতি হতে পারে)।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ : জীবনচর্চা ও পরিবেশের পরিবর্তন সাধন (পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ ও স্বাস'্যচর্চা), যথাযথ স্বাস'্যসেবা প্রদান ও পরিপূর্ণ স্বাস'্য শিক্ষা (বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে)।
|