-
জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বিশ্বনেতারা ঐক্যবদ্ধ হোন: বান কি মুন
জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ধনী-দরিদ্র, উন্নত-অনুন্নত সব দেশের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন।
সোমবার রাজধানী ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত তৃতীয় ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বান কি মুন এ আহ্বান জানান।
বান কি মুন বলেন, ‘বিশ্বের প্রত্যেক দেশই ক্ষতির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে কোনও দেশই হুমকির বাইরে নয়।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বিশ্বের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, সবাই ঐক্যবদ্ধ হন। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ দেশগুলোকে দেওয়া উন্নয়ন সহায়তা ও জলবায়ু সহায়তাকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। আমাদের আলাদাভাবে জলবায়ুর জন্য সহায়তা দিতে হবে। অনেক দেশই তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চাইছে।’
বান কি মুন বলেন, ‘গত মাসে ৭০০ কোটি জনসংখ্যা অতিক্রম করা এ বিশ্বকে নিরাপদ ও উন্নত হিসেবে গড়তে আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বান কি মুন বলেন, ‘মানুষ ও দেশ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতা ও মানুষের সমস্যা একই। এজন্য আমি আজ এখানে এসেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
বাংলাদেশে আগের সফরের কথা উল্লেখ করে বান কি মুন বলেন, তিন বছর আগে আমি এসেছিলাম। এছাড়া ১৯৭৩ সালেও আমি কয়েকবার এসেছিলাম।
বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
১৯৯১ ও ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এদেশের মানুষের মৃত্যু ও ক্ষতির কথার স্মরণ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেলে হাজারো জীবন বাঁচানো সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে শো-কেস হিসেবে দেখা যায়।’
‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝূকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর অন্যতম উদাহরণ বাংলাদেশ’, বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কিরিবাতির উদাহরণ দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, কিরিবাতির সর্বোচ্চ জমিটি সাগরপৃষ্ঠ থেকে ৩ মিটার উঁচু।
তিনি বলেন, ‘আমি কিরিবাতির ওই এলাকায় যখন গিয়েছিলাম, আমাকে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কার্বণ নিঃসরন হয় গত বছর।’
বাংলাদেশের কাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠনেরও প্রশংসা করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
ইউএনএফসিসিসির সব সদস্যর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মহাসচিব বলেন, ‘সিভিএফ থেকে আসা মতগুলোতে গুরুত্ব দিন।’
বান কি মুন বলেন, ডারবান সম্মেলনে এমন ঘোষণা আসবে বলে আমি মনে করছি যে, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের তহবিল বণ্টন ও নতুন তহবিল বণ্টনে আরও স্বচ্ছতা আসবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ দেশগুলোকে দেওয়া উন্নয়ন সহায়তা ও জলবায়ু সহায়তাকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। আমাদের আলাদাভাবে জলবায়ুর জন্য সহায়তা দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশগুলো চরম অনীহা ও উদাসীনতা দেখাচ্ছে। এই নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে এক হতে আহ্বান জানাচ্ছি’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জলবায়ু পরিতর্ননের সবচেয়ে অভিঘাত হচ্ছে, মানুষের শরনার্থী হওয়া।’
তিনি বলেন, ‘সংঘর্ষের কারণে স্থানচ্যুত হওয়ার চেয়েও জলাবায়ুর কারণে স্থানচ্যুত হওয়ার সংখ্যা অনেক বেশি।’
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের নেওয়া প্রকল্প ও উদ্যোগ সম্পর্কে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কোস্টারিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া ফিগারস ওলসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অন্যতম কারণ কার্বন নিঃসরণ। এজন্য আমরা দায়ী না হলেও আমরা ক্ষতির মুখে এবং এরইমধ্যে আমরা প্রকল্পও গ্রহণ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নই, তারাই কথা বলছি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে।’
ওলসেন বলেন, যারা খুবই শক্তিশালী দেশ, তারা কোনও কথাই শুনতে চায় না।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় ‘লো-কার্বন ইকোনমি’ গড়ে তুলতে আরও বহুপথ হাঁটতে হবে।’
কিরিবাতির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্ষতি অনুন্নত দেশের সৃষ্ট নয়। এ জন্য উন্নত দেশগুলোই দায়ী।
তিনি বলেন, ‘এই ফোরাম জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় ঝূকিপূর্ণ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম।’
মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ নাসিম তার বক্তব্যে বলেন, এবারের সম্মেলন ডারবানের জন্য বার্তা পাঠানো, কার্বন নিঃসরণ কমানো, অনুন্নত দেশগুলোকে সহায়তা করার বিষয়ে সফল হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি তার বক্তব্যে বলেন, গত দু’টি সিভিএফ সম্মেলনের চেয়েও এ সম্মেলন সফল হবে। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহায়তা করা তহবিল বণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোর করা সহায়তার প্রতিশ্রুতি সময়মতো পূরণ করা প্রয়োজন।’
পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে।’
ডারবান সম্মেলনে সময়মতো সহায়তা ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এখানে ঢাকা ঘোষণা প্রস্তুত করা হবে।
শুধু পৃথিবী নয়, মানবতাকে রক্ষার জন্যও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন হাছান মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘আসুন সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপক্ষে কাজ করি।
সিভিএফের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, ভুটান, কোস্টারিকা, ইথিওপিয়া, গাম্বিয়া, ঘানা, কেনিয়া, কিরিবাতি, মাদাগাস্কার, মালদ্বীপ, নেপাল, ফিলিপাইন্স, সেন্ট লুসিয়া, তানজানিয়া, তিমুল-লেসথে, তুভালু, ভানুয়াতু, ভিয়েতনাম।
|