প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই শান্তি ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গণজাগরণ সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রকৃত গণতন্ত্র ছাড়া সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি টেকসই হতে পারে না। গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে সমাজে দারিদ্র্য, অসাম্য, বঞ্চনা ও প্রান্তিকীকরণ বৃদ্ধি পায়, যা উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী গতকাল রূপসী বাংলা হোটেলে ‘জনগণের ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়ন’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তৃতাকালে একথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি টেকসই শান্তির জন্য ন্যায় বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটা তখনই অর্জন সম্ভব যখন ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জনগণকে অর্থপূর্ণ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে। তিনি জাতিসংঘের ৬৬তম সাধারণ অধিবেশনে শান্তি, ন্যায় বিচার ও উন্নয়নের জন্য জনগণের ক্ষমতায়ন শীর্ষক তার উত্থাপিত মডেল আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার জন্য উপস্থিত বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং এটি বিশ্ব মানবের কল্যাণে একটি ধ্রুপদী, সর্বজনীন ও কার্যকর মডেলে পরিণত হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নারায়ণ কাজি সেরেস্তা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রফেসর জিএল পেইরিস, ভারতের পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী শ্রী জয়রাম রমেশ, ভুটানের পূর্ত ও আবাসনমন্ত্রী নিয়নপো ইয়েশী জিমবা, মালদ্বীপের ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী হামেদ, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ড. জন ক্লোস ও ইউনেস্কোর ডেপুটি মহাপরিচালক গেটাচিউ ইনগিদা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
স্বাগত বক্তৃতা করেন পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস। জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধি এবং ঢাকা ও নয়াদিল্লির বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থা ও ডিপ্লোমেটিক মিশনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও শান্তি অধরাই থেকে যাচ্ছে। অথচ সব ধরনের উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। এছাড়া নতুন নতুন সমস্যা যেমন ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সঙ্কট ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ঋণ সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ ও দূষণমুক্ত প্রযুক্তির অভাব এবং ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা দারিদ্র্য সমাজগুলোকে অতি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়ে মূলধারা বিচ্ছিন্ন করছে।
প্রকৃত উন্নয়নের জন্য জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এজন্য প্রয়োজন দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য দূরীকরণ, সব ধরনের বঞ্চনার অবসান, সবার জন্য কর্মসংস্থান, সবার অধিকতর অংশগ্রহণ, টেকসই এবং সমতা ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন জোরদার এবং উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করা।
শেখ হাসিনা বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ, যারা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনা এমনকি জলবায়ু অক্ষমতা, দারিদ্র্য, অসাম্য, বঞ্চনা ও প্রান্তিকীকরণের শিকার, তাদের জন্য তার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন মডেল’ উত্সর্গ করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও সমতা নিশ্চিতকরণ এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দারিদ্র্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য এই মডেল বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, নারী-পুরুষের সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং জাতীয় জীবনের সবক্ষেত্রে নারীর সমান ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ উত্সাহিত করা হচ্ছে।
পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ইফতার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল গণভবনে তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের জন্য ইফতার পার্টির আয়োজন করেন। প্রধানমন্ত্রী ইফতার অনুষ্ঠানে অতিথিদের জন্য সাজানো বিভিন্ন টেবিল ঘুরে ঘুরে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন।
ইফতারের আগে দেশের জন্য অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা এম সালাউদ্দিন আহমেদ মোনাজাত পরিচালনা করেন।
অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, কাজী জাফরুল্লাহ, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, শেখ হেলাল এমপি, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি, শেখ কবির হোসেন, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম হোসেন, সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুুল্লাহ, নূর-ই-আলম লিটন চৌধুরী এমপি, বিশিষ্ট সাংবাদিক বেবী মওদুদ এমপি, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, শেখ জুয়েল, ইমরান আহমেদ এমপি, জোবেদা খাতুন পারুল এমপি, নূরজাহান বেগম এমপি এবং যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্থল সীমান্ত চুক্তি শিগগিরই অনুমোদন করবে ভারতীয় পার্লামেন্ট : ভারতীয় পার্লামেন্টে যত শিগগির সম্ভব ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি এবং এর প্রটোকল অনুমোদন করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন সফরত ভারতের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী শ্রী জয়রাম রমেশ। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে গতকাল তার সঙ্গে সাক্ষাত্কালে ভারতীয় মন্ত্রী এ আশ্বাস দেন। একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
প্রধানমন্ত্রী প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ জানান, চুক্তি ও প্রটোকল দ্রুত অনুমোদনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ করার প্রেক্ষিতে ভারতীয় মন্ত্রী ওই দুইটি বিষয় শিগগিরই ভারতীয় পার্লামেন্টে অনুমোদনের আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর সন্তোষজনক সমাধান ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থল সীমান্ত নির্ধারণ এবং অপদখলীয় ভূমি বিনিময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, ব্যক্তিগত সচিব আবদুল মালেক এবং ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ উপস্থিত ছিলেন।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, জয়রাম রমেশ উত্তর-পূর্ব ভারতে বিনিয়োগ করার জন্য বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এর ফলে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে আরও দৃঢ় হবে। বরাক নদের ওপর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ ও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উভয়ই বাংলাদেশের জনগণের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ওপর প্রস্তাবিত বাঁধের প্রভাবের বিষয় সমীক্ষা করার লক্ষ্যে একটি ‘জয়েন্ট এক্সপার্ট গ্রুপ’ সভা আয়োজন করার ব্যাপারে ভারতীয় উদ্যোগকে স্বাগত জানান। উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন, যত শিগগির সম্ভব বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু বিষয় ছিল কঠিন, কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিশেষত, নিরাপত্তার বিষয়ে, ট্রানজিট অনুমোদন এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে। ভারতের সঙ্গে সব পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক সব বিষয়াদি নিয়ে নিবিড় যোগাযোগের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এটা পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দু’দেশের অগ্রগতিতে সহায়ক হয়েছে।