ভাড়ায় বসানো হচ্ছে সোলার প্যানেল
নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে অনেক গ্রাহকই অল্প সময়ের জন্য ভাড়া নিচ্ছেন সোলার প্যানেল। নতুন ভবন, অফিস কিংবা ব্যাংকের এটিএম বুথের ছাদে সাময়িকভাবে এসব প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার পর তা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার ব্যবহার করছেন ডামি সোলার প্যানেল, যা আসলে পুরনো ব্যাটারিচালিত এক ধরনের আইপিএস। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে সৌরবিদ্যুৎ চালুর বাধ্যবাধকতায় এ ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে।
সরকার গত বছর নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে আবাসিক খাতে সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ, বাণিজ্যিকে ৭ ও শিল্প-কারখানায় ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের এটিএম বুথগুলোয় বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক শ্রেণীর বাধ্যকতা মেনে চলার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী সোলার প্যানেল বসানোর পর তা পরীক্ষা করে দেখে বিতরণ কোম্পানির প্রতিনিধি দল। এর পরই নতুন সংযোগের অনুমোদন দেয়া হয়।
বিদ্যুতের বিকল্প উৎস তৈরি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়াতে এ উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে তা কাজে আসছে না। বরং অর্থের বিনিময়ে বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নামে দেয়া হচ্ছে নতুন সংযোগ। এ রকম প্রতারণার মাধ্যমে সংযোগ পাইয়ে দেয়ার শর্তে ব্যবসাও ফেঁদে বসেছে একটি চক্র; যারা ভাড়ায় কিংবা অল্প ব্যয়ে ডামি সোলার প্যানেল বসানোর কাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর গুলিস্তান ও নবাবপুর সড়ক এলাকায় সোলার প্যানেলকে ঘিরে এ ধরনের ব্যবসা এখন জমজমাট। এসব এলাকায় ১০০ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল সেল আমদানি করে তাতে ১৫০ বা ২০০ ওয়াটের স্টিকার লাগিয়ে দেয়া হয়। এ চক্রই আবার ছাদে ডামি প্যানেল বসায়, যা আসলে পুরনো ব্যাটারিচালিত এক ধরনের আইপিএস। ডামি প্যানেলে ব্যবহূত দুর্বল এসব ব্যাটারি চার্জ হতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। এভাবেই চলছে সোলার প্যানেলের নামে ছোট আকারের আইপিএসের কারবার।
সম্প্রতি এ ধরনের বেশ কিছু অভিযোগ বিদ্যুৎ বিভাগের নজরে এসেছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। এ কারণে সোলার প্যানেল পরীক্ষা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আগামীকাল এ ব্যাপারে একটি বৈঠক হওয়ার কথা। বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল অ্যানার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) প্রতিনিধি বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।
এ প্রসঙ্গে বিএসআরইএ সভাপতি দীপাল বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সৌরশক্তি ব্যবহারে বাধ্যবাধকতার নিয়ম করা হলেও তদারকের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সংযোগ দেয়ার পর তা আর তদারক করা হয় না। বিতরণ কোম্পানির পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে তদন্ত করার ব্যবস্থা রাখা উচিত। কঠোর তদারকের মাধ্যমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিলে সোলার প্যানেল বসানোর বাধ্যবাধতার উদ্দেশ্য সফল হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি আবাসিক ভবনে চাহিদার ৩ শতাংশ সৌরশক্তি উত্পাদন করতে ৫-১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিছুদিন আগে মগবাজারে খ্যাতনামা একটি অ্যাপার্টমেন্ট কোম্পানির আবাসিক ভবনে ডামি সোলার ব্যবহার করে সংযোগ নেয়া হয়। এ ভবনে ২ দশমিক ৪ কিলোয়াটের সৌরশক্তি স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল, যার জন্য প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হতো। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র দেড় লাখ টাকায় ডামি সোলার প্যানেল বসিয়ে সংযোগ চালুর ব্যবস্থা করে দেয়।
ঢাকার বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির অফিসের দেয়ালেও সোলার প্যানেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এক ব্যবসায়ী জানান, সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষ ব্যাংক নিউমার্কেট ও উত্তরায় নতুন দুটি এটিএম বুথ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে একটিতে ৪ ও অন্যটিতে ২ কিলোওয়াট সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। এ জন্য ৮ ও সাড়ে ৪ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে প্রস্তাব দিয়েছে প্রথম সারির একটি প্রতিষ্ঠান। অথচ দুটি বুথে ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে সংযোগ দেয়া সম্ভব বলে দাবি করছে সোলার প্যানেল স্থাপনকারী অন্য একটি প্রতিষ্ঠান।
সরকারের তদারকের অভাবেই ভাড়াভিত্তিক সোলার প্যানেলের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন রহিমআফরোজের পরিচালক নিয়াজ রহিম। এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সরকার যে কারণে উদ্যোগ নিয়েছে, তার পুরোটাই বিফলে যাচ্ছে যথাযথ তদারকের অভাবে।
জানা যায়, সোলার প্যানেল স্থাপন ব্যয়বহুল বলে ডিমান্ড নোট পেয়েও অনেক রিয়েল এস্টেট ও হাউজিং কোম্পানি তাদের নবনির্মিত অ্যাপার্টমেন্টে বিদ্যুৎ সংযোগ নিচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে যখন ফ্ল্যাট তৈরি ও বিক্রি করা হয়, তখন এ ধরনের কোনো শর্ত ছিল না। এখন ক্রেতারাও সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য নির্মাতাকে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে রাজি নন। এতে অধিকাংশ নতুন ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়টি ঝুলে আছে।
সোলার প্যানেল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, ‘আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নিয়ম মেনেই সোলার বসাচ্ছে। এর জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু কয়েক বছর পর এটি ব্যবহারের মেয়াদ শেষ হলে পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বিদ্যুৎ খাতের সমাধানে এটি কার্যকর কোনো সমাধান নয়।’