|
|
|
-
প্রেমের প্রতিশোধ নিতেই ব্যাগে বোমা তুলে দিই
প্রতিশোধের এ এক অভিনব কৌশল। প্রেমিকার ভ্যানিটি ব্যাগে বোমা ভরে দেয় প্রেমিক। খানিক পরে বোমার আঘাতে উড়ে যায় প্রেমিকা আয়েশার কোমর থেকে পেছনের অংশ। নৃশংস এ ঘটনার দেড় ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার হওয়া প্রেমিক জোবায়ের আহমেদ স্বীকার করেছে নিজের দায়। পুলিশকে সে বলেছে, আয়েশার প্রেম-প্রতারণা সহ্য হয়নি। তাই ওকে মারতে ২০ হাজার টাকায় বোমা কিনেছি। পরে ওর ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে দিয়ে কৌশলে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উচিত শিক্ষা দিয়েছি। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফিসের সামনে আয়েশার ব্যাগে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে রাস্তায় ছোপ ছোপ রক্ত দেখা গেছে। ঘটনাস্থল থেকে আয়েশার ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া ভ্যানিটি ব্যাগ, পাইপের টুকরা, মোবাইলের সার্কিট, একটি বাংলালিংক সিম উদ্ধার করেছে পুলিশ। চিকিৎসাধীন আয়েশা সিদ্দিকা মানবজমিনকে বলেন, জুবায়ের আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। টিফিনের কথা বলে বোমার বক্স সরবরাহ করেছিল। ওই বক্সটি ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে অফিসের দিকে কিছুদূর এগোতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রথমে মনে করেছি আমার আশপাশে কোথাও বিস্ফোরণ হয়েছে। পরক্ষণেই বুঝতে পারি আমি নিজেই আক্রান্ত। তখন পেছনের দিকে ভীষণ জ্বালাপোড়া করছিল। পরে রক্তাক্ত ও অবশ হয়ে মটিতে পড়ে যাই। এরপর আর কিছুই জানি না। আয়েশার বড় বোন নূরজাহান বলেন, জুবায়ের বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)-এর কম্পিউটার প্রোগ্রামার। তারই সহকারী কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে চাকরি করে আয়েশা সিদ্দিকা। একই অফিসে চাকরির সুবাদে মাঝে মধ্যেই তাকে উত্ত্যক্ত করতো জুবায়ের। বয়সে সে আয়েশার ছোট। তা সত্ত্বেও আয়েশাকে তুমি করে বলতো। এ নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার ঝগড়া হয়েছে। একই অফিসে চাকরি করায় ফের মীমাংসাও হয়েছে। পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি ইমাম হোসেন বলেন, আয়েশার সঙ্গে জুবায়েরের দেড় বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রথম দিকে আয়েশাই জোর করে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে ধীরে ধীরে তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে আরও একাধিক ছেলের সঙ্গে ওঠাবসা করছিল। এ কারণে জুবায়ের ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে শিক্ষা দিতে ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি বোমা কেনে। পরে ওই বোমা কৌশলে আয়েশার ব্যাগে ভরে বিস্ফোরণ ঘটায়। তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িত জুবায়ের ও তার সহযোগী নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বোমা সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তারের জন্য একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. ছানোয়ার হোসেন বলেন, বিস্ফোরিত বোমাটি আই ই ডি (ইমেপ্রাভাইজ্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের বোমা সাধারণত জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা তৈরি ও ব্যবহার করে থাকে। এটির বিস্ফোরণে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। চিকিৎসাধীন আয়েশা বলেন, টিফিনের কথা বলে প্যাকেটটি ধরিয়ে দিয়ে জুবায়ের বলে, আমার একটি মিটিং আছে। এটি আমার টেবিলে রেখে দিও। ওই প্যাকেটটি ব্যাগে নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয়ের সামনে থেকে পিকেএসএফ ভবনের সামনে আসা মাত্রই বিস্ফোরণ ঘটে। শেরেবাংলানগর থানার ওসি জাকির হোসেন মোল্লা বলেন, বোমা বিস্ফোরণের নেপথ্যে নিছক প্রেম নাকি জঙ্গি কানেকশন আছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় জুবায়ের আহমেদ ও নুরুল ইসলাম নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার প্রতক্ষদর্শী ফুটপাতের চা বিক্রেতা মালেক বলেন, হঠাৎ বিকট শব্দ শুনেই তাকিয়ে দেখি, এক মহিলা পিকেএসএফ ভবনের সামনে থেকে দৌঁড়ে এসে পড়ে গেল। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। আর্ত চিৎকার করছিলেন। আর বলছিলেন, আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান। গোয়েন্দারা জানান, সকালে আগারগাঁওয়ের ইসলামী ফাউন্ডেশন কার্যালয়ের সামনে আয়েশার সঙ্গে জুবায়েরের দেখা হয়। এ সময় জুবায়ের তাকে একটি প্যাকেট দিয়ে সেটি অফিসে পৌঁছে দিতে বলে। আয়েশা তার বড় বোন নুরজাহানের শ্যামলী ১ নম্বর গলির ৬/৮ নম্বর বাড়িতে থাকেন। প্রতিদিন ওই পথেই আসা যাওয়া করেন। তার গ্রামের বাড়ি জামালপুর জেলার সদর থানার ছোনোছটিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম নূরুল ইসলাম। ২ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে আয়েশা তৃতীয়। অন্যদিকে জুবায়ের বিবাহিত। তার ঘরে স্ত্রী ও এক ছেলে রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি ইমাম হোসেন বলেন, আয়েশার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার এক ঘণ্টা পরেই কাজীপাড়া থেকে জুবায়ের ও তার সহযোগী নূরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, বিস্ফোরিত বোমাটি মোবাইল নিয়ন্ত্রিত। বোমাটির সঙ্গে একটি মোবাইল সংযুক্ত করা ছিল। দূর থেকে ওই মোবাইলে কল করার সঙ্গে সঙ্গেই বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। আয়েশার ছোট ভাই তারিকুল ইসলাম বলেন, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করার পর তার বোন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে (বিসিসি) প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ শুরু করে। মাঝখানে কিছুদিন নরসিংদীতে কাজ করার পর দেড় মাস আগে আবারও আগারগাঁওয়ের বিসিসি’র প্রধান কার্যালয়ে বদলি হয়।
|
|
|
|