রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সক্ষমতার অভাবে বড় ধরনের জরিমানার মুখে পড়েছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা। পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে অতিরিক্ত তেল ব্যবহারে গচ্চা দিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এরই মধ্যে এ খাতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) আদায় করেছে প্রায় ১২৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগকারীরা বিষয়টি স্বীকার করে দোষ চাপিয়েছেন বিউবোর ওপর। তারা নিম্নমানের তেল সরবরাহের জন্য বিউবোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
জানা যায়, গত এপ্রিল পর্যন্ত ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে অতিরিক্ত তেল ব্যবহারের কারণে বিউবো আদায় করেছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৩০ হাজার ৩৮৭ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ ১২৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকারও বেশি। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উত্পাদনে ব্যয় হওয়ার কথা দশমিক ২২ লিটার তেল। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ব্যয় করছে দশমিক ২৬ বা দশমিক ২৭ লিটার। এ বাড়তি তেলেও ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে সরকারকে।
বিউবো সূত্র জানায়, অতিরিক্ত তেল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, অটবি, রহিমআফরোজ, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি ও দেশ এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠান। শীর্ষে আছে অটবির কোয়ান্টাম পাওয়ার। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ১১০ মেগাওয়াট এ কেন্দ্রটি থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে ৫০ লাখ ৫৫ হাজার
২৪২ ডলার।
একই সময়ে চট্টগ্রামের শিকলবাহায় ফার্নেস অয়েলের এনার্জি পাওয়ার করপোরেশনের ৫৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ২২ লাখ ৫৫ হাজার ৭২০, রহিমআফরোজের আরজেড পাওয়ারের ঠাকুরগাঁও ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ২২ লাখ ৪৭ হাজার ৬৭৬ এবং দেশ এনার্জির সিদ্ধিরগঞ্জে ৯৫ দশমিক ৭৭ মেগাওয়াটের ডিজেলচালিত কেন্দ্র থেকে ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭ ডলার আদায় করা হয়েছে।
ওরিয়ন গ্রুপের ফার্নেস অয়েলচালিত মেঘনাঘাট ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ৩ লাখ ৩ হাজার ৬৫৫, একই ক্ষমতার সিদ্ধিরগঞ্জ কেন্দ্র থেকে ৪ লাখ ১০ হাজার ৪৮৯, নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জে সামিটের ১০২ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ৯ লাখ ২২ হাজার ৬৬৫ এবং খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিসিএল) ১১৫ মেগাওয়াট
কেন্দ্র থেকে ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৯১৯ ডলার
আদায় হয়েছে।
খুলনায় ডিজেলচালিত ৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এগ্রিকোর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ লাখ ৭ হাজার ৭২, নরসিংদীর ঘোড়াশালে এগ্রিকোর ৪৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ লাখ ২ হাজার ৩১৭, একই স্থানে একই প্রতিষ্ঠানের ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫ লাখ ১০ হাজার ৪১৪ ডলার কেটে নিয়েছে বিউবো। এ ছাড়া নোয়াপাড়ায় খানজাহান আলী পাওয়ার কোম্পানির ৪০ মেগাওয়াটে অতিরিক্ত তেল লাগে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪৭৯ ডলারের এবং নারায়ণগঞ্জের পাগলায় ডিপিএ পাওয়ার জেনারেশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে লাগে ২ লাখ ২৬ হাজার ৬৪১ ডলারের তেল।
বিউবোর টাকা কেটে নেয়ার বিরোধিতা করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলছে, চুক্তি অনুযায়ী গুণগত মানের তেল সরবরাহ না করায় অতিরিক্ত তেল লাগছে এবং ভেজাল তেল ব্যবহারে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির সমস্যা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রতি লিটার তেলে স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ শতাংশ কম তাপ উত্পন্ন হচ্ছে। এ কারণে বিউবোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। আর তাদের আবেদনের বিষয়টি মূল্যায়ন করতে একটি কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোফাজ্জেল হোসেনের নেতৃত্বে এ কমিটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের কাজ করছে। চলতি সপ্তাহে এ মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হবে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী মানসম্পন্ন তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। তেলে পানি ও অন্যান্য ভেজাল উপাদান মিশ্রিত থাকে। তাই সরকারের কাছে আমরা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছি। বিউবোর মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনের পর এ ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত জানা যাবে।’
তবে এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘আমরা একই মানের ফার্নেস অয়েল (১৮০সিএসটি) ও ডিজেল (২৫ শতাংশ সালফার) আমদানি করি। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই এ তেল আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়। তাই চুক্তি অনুযায়ী যে তেল সরবরাহ করার কথা, তা-ই সরবরাহ করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত তেলের দাম আদায় করা হলেও এর জন্য সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে। কারণ প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলে ১ টাকা ও ডিজেলে সাড়ে ১২ টাকা করে ভর্তুকি দেয় বিপিসি। তাই তেল অপচয় রোধ করা জরুরি বলে মনে করছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।