|
|
|
ক্যামেরার সামনে কথার খই ফোটে না তাদের মুখে। শাণিত পা দিয়ে তারা কথা বলান বলকে। ক্ষুরধার সৃষ্টিশীলতার জন্য একজন ইতালির মাঝমাঠের জেনারেল, আরেকজন জার্মানির আক্রমণ তৈরিতে পাসের ফুলঝুরি ছোটান মাঝমাঠে। সাদা চোখে লড়াইটা শুধুই জার্মানি-ইতালির। বাড়িয়ে বললে শোয়েইনস্টাইগার-বারজাগলি, মুলার-ব্যালজারাত্তি কিংবা নিউয়ার-বাফনের। কিন্তু তাদের কারও দ্বৈরথেই শাসিত হবে না সেমিফাইনাল। আজ্জুরিদের আন্দ্রে পিরলো এবং জার্মানদের মেসুত ওজিল_ তাদের দ্বৈরথের ওপরই নির্ভর করছে ওয়ারশ' মহারণের গতিপ্রকৃতি।
মেসুত ওজিল : আমরাই
ফাইনালে যাব
বিনয়ী, সদালাপী এসব বিশেষণ খুব ভালো যায় ওজিলের সঙ্গে। তুর্কি বংশোদ্ভূত এ মিডফিল্ডারের আরেকটি পরিচয় 'জার্মানির জিদান' নামে। মাঝমাঠের ছন্দময় উপস্থিতি এবং অসাধারণ উদ্ভাবনী ক্ষমতার জন্য তার সম্পর্কে হোসে মরিনহোর উক্তি_ 'ওজিল অনন্য। তার অনুকরণ করা সম্ভব নয়। এমনকি নিকৃষ্টভাবেও সম্ভব নয়।'
মাঠে তার উপস্থিতি ফরোয়ার্ড মারিও গোমেজের ঠিক পেছনেই। আক্রমণ তৈরি এবং শানানো_ দুটোই করে থাকেন। তার প্রতিভার ছিঁটেফোটা দেখা গেছে ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে। গ্রিসের বিপক্ষে জার্মানির চার গোলের দুটির উৎস ছিলেন ওজিল। আসরে সব মিলিয়ে জার্মানির করা নয় গোলের তিনটির উৎস ছিলেন রিয়াল এ তারকা। তবে ঐতিহ্যগতভাবেই ইতালির 'কাতানোচ্চিও' মডেলের রক্ষণ যেন চীনের মহাপ্রাচীরতুল্য। ওজিলকে আজ চিড় ধরাতে হবে সে দেয়ালে। আত্মবিশ্বাসের স্ফুরণ ঘটিয়ে ২৩ বছর বয়সী তারকা বলেন, 'নিজেদের খেলা খেললে আমরা ইতালিকে হারাতে পারব। শিরোপা জিততেই আমরা এখানে এসেছি। আমার বিশ্বাস তা করতে পারব।' কিন্তু ইতালির মাঝমাঠের কেন্দ্রে পিরলো নামের এক 'জিনিয়াস' আছেন। আজ্জুরিদের গোলপোস্টে আক্রমণ শানাতে আগে পিরলো বাধা টপকাতে হবে ওজিলকে_ দ্বৈরথটি তাই হতে যাচ্ছে ফ্রেমে বেঁধে রাখার মতো।
পরিসংখ্যান বলছে ইতালির বিপক্ষে বড় আসরে এখন পর্যন্ত জয়বঞ্চিত জার্মানি। আর ওজিল বলছেন এসব নিরেট সংখ্যায় তার কোনো আগ্রহ নেই। 'এসব পরিসংখ্যানে আমার কোনো আগ্রহ নেই। অতীত পেছনে ফেলে নিজেদের ইতিহাস আমরা নিজেরাই লিখতে চাই'_ যোগ করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফুটবল ম্যাগাজিন 'ফোর ফোর টু'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওজিল একবার বলেছিলেন_ 'জার্মানিতে আমি তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে এসেছি। আমার বাবা বেড়ে উঠেছেন এখানে। তুরস্ক আমার জন্য বিশেষ কিছু হলেও জার্মানির হয়ে খেলতেই আমি ভালোবাসি।' ২০০৯ সালে জার্মানির জার্সি গায়ে চাপিয়ে তৃতীয় ম্যাচেই গোল করে ভালোবাসার যথার্থতা প্রমাণ করেন। গেল বিশ্বকাপে জার্মানির মাঝমাঠে ফুল ফুটিয়ে গায়ে সেঁটে নেন 'তারকা' তকমা। এখন তিনি দাঁড়িয়ে জার্মানদের ১৬ বছরের শিরোপা-খরা কাটানোর চ্যালেঞ্জের সামনে। চূড়ামণি থেকে মাত্র দুই ধাপ দূরে থেকে ওজিল বলেন, 'আজকের মানসিক দৃঢ়তা অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। সামান্য ভুলে সব মাটি হয়ে যেতে পারে। তবে গেল ম্যাচে নিজের পারফরম্যান্সে আমি সন্তুষ্ট। ইতালির বিপক্ষে সে ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করব।'
ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম ধর্মের অনুসারী ওজিল প্রতি ম্যাচের আগে নিয়ম করে একটি কাজ করে থাকেন_ পবিত্র কোরআন শরিফ পাঠ। বার্লিনকেন্দ্রিক এক দৈনিককে জার্মান তারকা এর আগে জানান, 'মাঠে নামার আগে আমি সবসময় ওই (কোরআন পাঠ) কাজটি করে থাকি। সতীর্থরা জানে, সংক্ষিপ্ত সে সময়টুকুতে কথা বলা নিষেধ।'
আন্দ্রে পিরলো :ভয় পেয়েছে জার্মানি
'পিরলো হলো নীরব ঘাতক। তার পা কথা বলে'_ মার্সেলো লিপ্পি। ২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী ইতালি কোচের এমন উক্তি করা অসার নয়। সর্বোচ্চসংখ্যক গোল বানানো এবং ফাইনালসহ তিনবার ম্যাচসেরা হয়েছিলেন পিরলো জার্মানি বিশ্বকাপে। সতীর্থরা তার নাম দিয়েছিল 'লা আর্কিটেক্টো'। ইনজুরির কারণে গেল বিশ্বকাপে মাত্র একম্যাচ খেলায় ইতালিও বাদ পড়ে গ্রুপ পর্ব থেকে। ইউরোতে আবারও চেনা রূপে দেখা দিয়েছেন ইতালির মাঝমাঠের 'স্থপতি'। কোয়ার্টার ফাইনালে তা দেখেছে ইংলিশরা। এবার জার্মানদের পালা।
ইতালির মাঝমাঠের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান পিরলোর। পুতুলনাচে যেমন পেছন থেকে সুতো টেনে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন নির্মাতা, পিরলোও তেমনি মাঝমাঠ থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন খেলার গতিপ্রকৃতি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে সর্বোচ্চ ১৩১টি পাস বেরিয়েছিল তার শানিত পা থেকে। বালোতেলি্লরা মিস না করলে তা থেকে গোল হতে পারত কমপক্ষে ১০টি! টাইব্রেকারে তার 'চামচ' শটে গোল করা তো এবারের ইউরোর সেরা চিত্রগুলোর একটি।
২০০৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের সে স্মৃতি এখনও মনে আছে ৩৩ বছর বয়সী এ তারকার। জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ইতালি। ইউরোর সেমিফাইনালেও একই প্রতিপক্ষকে পেয়ে পিরলো বলেন, 'জার্মানি অবশ্যই আমাদের দেখে ভীত। অতীতে যা হয়েছে তা এড়ানোর জন্য অতিসাবধানী থাকবে তারা। ২০০৬ আসরের পুনরাবৃত্তি চায় না জার্মানরা।' ওই বিশ্বকাপের ফাইনালে পিরলোর অসাধারণ পাস থেকেই ফরাসিদের বিপক্ষে সমতায় ফিরেছিল আজ্জুরিরা। টাইব্রেকার নাটকেও গোল করেছিলেন পিরলো।
এবারের ইউরোতে ইতালির চার ম্যাচেই মাঠে ছিলেন পিরলো। খেলেছেন মোট ২৯০ মিনিট। এক গোল করার সঙ্গে সতীর্থদের দিয়ে দুটো করিয়েছেন। গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ইতালির মাঝমাঠের প্রাণ ছিলেন তিনি। শেষ আটে ইংলিশদের বিদায়ের নেপথ্যেও ছিলেন পিরলো। কিন্তু জার্মানদের সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিপক্ষ বলেই মনে করছেন জুভেন্টাস তারকা। 'তারা অসাধারণ দল। শেষ ২০ বছরে তারা ছয়টি সেমিফাইনাল খেলেছে। কিন্তু আমরা তাদের খুব ভালোভাবে পরখ করেছি। তাদের দুর্বলতা জানি আমরা' যোগ করেন পিরলো।
বড় আসরে ইতালিকে দেখা যায় আসল চেহারায়। ইউরোর আগে গ্রুপ পর্বে রাশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরেছিল ইতালি। ম্যাচ পাতানোর কলঙ্কও ছিল তাদের কাঁধে। কিন্তু মূলপর্বে কী দেখা গেল! তরতর করে সেমিতে উঠে এলো সিজার প্রানদেলি্লর দল। পিরলো মনে করেন রুশদের কাছে হেরে আদতে লাভ হয়েছে তাদের। 'রাশিয়ার কাছে হেরে ভালো হয়েছে। আমাদের পা মাটিতে ফিরেছে তাতে। এখন আমরা শেষ চারে উঠেছি। কিন্তু আসল কাজটি এখনও বাকি আছে' যোগ করেন পিরলো।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তার অসাধারণ 'চিপ' মনে করিয়ে দেয় ১৯৭৬ সালের ইউরো আসরের চেক তারকা অ্যান্টন প্যানেকাকে। একই রকম শটে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে গোল করেছিলেন প্যানেকা। ৩৬ বছর পর পিরলো ফিরিয়ে আনলেন সে স্মৃতি।
জার্মানদের বিপক্ষে হয়তো নতুন কিছু নিয়ে হাজির হবেন পিরলো।
|
|
|
|