|
|
|
-
চোরাইপথে আসছে ভারতীয় মোটরসাইকেল
দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তপথে চোরাচালান হয়ে আসছে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় মোটরসাইকেল। এভাবে প্রতিবছর আসছে ৫০ হাজারেরও বেশি মোটরসাইকেল। অবৈধ লেনদেন হচ্ছে ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। এরফলে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন মোটরসাইকেলের দেশীয় উদ্যোক্তারা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ টি সীমান্ত পথে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় মোটরসাইকেল আসছে চোরাচালানের মাধ্যমে। সীমান্তপথগুলো হচ্ছে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর ও সংলগ্ন এলাকা, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি, নওগাঁর ধামুইরহাট, পতœীতলা ও সাপাহার , চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর ও শিবগঞ্জ, রাজশাহীর পবা ও বাঘা এবং নাটোরের লালপুর। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের যশোর, সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়া সীমান্ত পথেও ভারত থেকে উলেল্লখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় মোটরসাইকেল আসছে। জানা গেছে এসব এলাকায় ভারতীয় মোটরসাইকেলের চোরাইব্যবসা বেশ রমরমা।
মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীরা জানান, যে মোটরসাইকেলটির দাম বাংলাদেশের বাজারে পৌনে দুই লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। চোরাইপথে আসা সেই সাইকেলটি পাওয়া যাচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। ভয়াবহ খবর হলো এই অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোর ও যুব সমাজ।
জানা গেছে, মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে দেশে বিশাল অংকের বিনিয়োগ হয়েছে। সেসব সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ এখন ঝুঁকির মুখে। একদিকে আমদানির উপর থেকে শুল্ক কমানো; অন্যদিকে চোরাই মোটরসাইকেল- এসব মিলে দেশীয় অটোমাবোইল শিল্পের জন্য যাচ্ছে দুর্দিন।
র্যাব-৫ (রাজশাহী)’র একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলের সীমান্তপথে ভারতীয় মোটরসাইকেল আসছে। তবে মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিছু কিছু ধরাও পড়ছে। তিনি জানান, গত এক বছরে চোরাচালান হয়ে আসা শতাধিক ভারতীয় মোটরসাইকেল আটক করেছে র্যাবের একটি ইউনিট। তার মতে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলার সীমান্তগ্রাম ও হাটবাজারগুলিতে বৈধ কাগজপত্রবিহীন ভারতীয় মোটরসাইকেল চলতে দেখা যায়। সড়ক বা মহাসড়কে না উঠলে এসব মোটরসাইকেল আটক করা যায় না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুত্রগুলো জানিয়েছে, নওগাঁর সাপাহারের গোপালপুর সীমান্তপথে সবচেয়ে বেশি চোরাই মোটরসাইকেল আসে। এই সীমান্তের ওপারে দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার থানা শহর তপনগঞ্জ। বাংলাদেশী চোরাচালানিরা ওপারের শোরুম থেকে মোটরসাইকেল কিনে সহজেই এপারে আনতে পারেন। সাপাহারের খঞ্জনপুর গ্রামের এক চোরাচালানি বলেন, অর্ডার পেলে ২৪ ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে ভারতীয় যে কোন কোম্পানির নতুন মোটরসাইকেল এনে দিতে পারেন তিনি। উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষীদের ম্যানেজ করেই তারা এ কাজটি করে থাকেন। যদিও স্থানীয় বিজিবির সদস্যরা বলেছেন, তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে রাতের বেলায় মোটরসাইকেল চোরাচালান হয়ে আসে। তাদের দাবি- বিজিবি বহু ভারতীয় মোটরসাইকেল জব্দ করেছে।
সাপাহারের শীতলডাঙ্গা গ্রামের মোটরমেকানিক শহিদুল ইসলাম বলেন, নওগাঁ’র বড় বড় হাটবাজারে যেসব ভারতীয় মোটরসাইকেল দেখা যায় সেগুলির অধিকাংশই অবৈধপথে আনা। তিনি আরো জানান, ১৫০ সিসির একটি পালসার বাংলাদেশের কোন শোরুমে কিনতে গেলে প্রায় সোয়া ২ লাখ টাকা পড়বে। কিন্তু সীমান্তপথে আসা একই মোটরসাইকেল পাওয়া যাচ্ছে ১ লাখ ২০ থেকে ৩৫ হাজারের মধ্যে। এর সঙ্গে আর মাত্র ২০ হাজার টাকা খরচ করলে বিআরটিএ থেকে সব কাগজই ম্যানেজ করা যায়। শহিদুল আরো জানান, চোরাই পথে আসা এসব মোটরসাইকেল কিনতে রংপুর, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে লোকজন প্রতিদিন সাপাহারে এসে ভিড় করছেন।
কয়েকদিন আগে বদলী হয়ে যাওয়া বিজিবির ৯ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মুনজুরুল ইসলাম বলেন, মাঝে মাঝেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভারতীয় মোটরসাইকেল জব্দ করে বিজিবি। তবে সমস্যাটা হলো ভারতে প্রস্তুতকৃত অধিকাংশ ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল আমদানি হয় এবং দেশেই বৈধভাবেই কেনার সুযোগ থাকায় চোরাচালানিরা সীমান্তপথে এসব গাড়ি আনার সুযোগ পাচ্ছে।
রাজশাহী বিআরটিএর একটি সুত্রে জানা গেছে, চোরাই মোটরসাইকেল কিনে আমদানিকারক নিযুক্ত ডিলারদের শোরুম থেকে প্রথমে একটি কাগজ নেয়া হয়। পরে ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে নিবন্ধন নেয়া হয়। সুত্রটি আরো জানায়, বিআরটিএতে নিবন্ধনের সময় গাড়িটির আমদানি সংশ্লি¬ষ্ট কিছু কাগজও জমা দিতে হয়। ডিলার বা দালালরা সেটাও ম্যানেজ করে দেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে আমদানিকারকরাও কাগজপত্র সরবরাহ করে থাকেন। ফলে বিআরটিএ অবৈধপথে আসা মোটরসাইকেলগুলিরও নিবন্ধন দিতে বাধ্য হচ্ছে।
এ ব্যাপারে রাজশাহীর রানীবাজারের মোটরসাইকেল ডিলার রহমান এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী শরিফুল ইসলাম স্বীকার করেন ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেলের কারনে দেশীয় মোটরসাইকেলের বাজার নষ্ট হচ্ছে। ব্যবসার বিপুল ক্ষতি হচ্ছে তাদেরও। শোরুমগুলোতে বৈধ মোটরসাইকেল বিক্রি কমে গেছে।
এ ব্যাপারে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি বলেন, মোটরসাইকেল চোরাচালানে লাভ বেশি বলে এদিকেই ঝুঁকছে অনেকেই। উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্ত জেলাগুলোতে চোরাই মোটরসাইকেল কম দামে সহজে কিনতে পাওয়া যায় বলে লোকজন এগুলো কিনে থাকে। পুলিশের অভিযানে ধরাও পড়ে। তবে একই ধরনের ভারতীয় মোটরসাইকেল যেহেতু আমদানি হয় সেকারনে কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ তা পুলিশ সহজে শনাক্ত করতে পারে না।
অন্যদিকে রাজশাহী বিআরটিএ’র সহকারি পরিচালক এটিএম জালালউদ্দিন বলেন, চোরাই মোটরসাইকেলের কারণে দেশে তৈরি ও আমদানিকৃত মোটরসাইকেলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর এতে সরকার বছরে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। তিনি ভারতীয় মোটরসাইকেলের চোরাচালান বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানান।
|
|
|
|