|
|
|
-
রাতভর প্রতীক্ষা শেষে কাঙ্ক্ষিত টিকিট
‘ভাই আর বইলেন না। পাঁচ মিনিটের জন্য টিকেটটা পাই নাই। কত রিকোয়েস্ট করছি, কথা শুনলোই না। টিকেট দেওয়া বন্ধ কইরা দিল। তারপর সারা রাত অপেক্ষা।’
আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বললেন সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাসেল মাহমুদ। রাত ৯টার একটু পর কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছেন তিনি।ততোক্ষণে কাউন্টার বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন টিকেটসেলার। শত অনুরোধেও টিকিট পেলেন না। আর তাই টিকিটের জন্য রাতভর তাকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে হলো।
শনিবার রাতভর কমলাপুর রেলস্টেশন জুড়ে ছিল কয়েকহাজার মানুষ। ঈদের ছুটিতে প্রিয়জনদের কাছে যাওয়ার জন্য স্টেশনে রাত কাটিয়েছেন তারা। ছেলে, বুড়ো এমনকি নারীদেরও দেখা গেছে টিকেট সংগ্রহের সারিতে। সংবাদপত্র বিছিয়ে তার উপর বসে বসেই রাত কাটিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার বাসা থেকেই সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বিছানার চাঁদর। বালিশ আনতেও ভোলেননি।
‘ঈদের আগে স্টেশনে এক রাত কাটানো অনেকটা উৎসবে পরিণত হয়ে গেছে। গত দুই বছর ধরে এভাবেই কাটিয়ে আসছি। আমার কখনই কষ্ট অনুভব হয় না। বরং বেশ আনন্দেই রাতটা পার হয়ে যায়।’
বগুড়ার সান্তাহারের টিকিট কিনতে আসা আবু তাহের এভাবেই বললেন স্টেশনে তার রাত কাটানোর অনুভূতি।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই স্টেশনে রাত কাটাতে এসে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। একসঙ্গে রাত কাটাই। বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এটাও কম পাওয়া নয়।’
শনিবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয় টিকিটের জন্য এই অপেক্ষা। রাতভর মানুষের গুঞ্জনে মুখর ছিল পুরো স্টেশন। রাতের মাঝামাঝি কিংবা শেষ সময়েও অপেক্ষমানদের দলে ভিড়েছেন অনেকে। সকালের আলো ফুটতে ফুটতে বাড়তে থাকে মানুষের ভীড়। দীর্ঘ হতে থাকে টিকিটের জন্য অপেক্ষমান মানুষের সারি।
রোজার মাস হওয়ায় অনেকেই বাসা থেকে সেহরি নিয়ে আসেন। অনেকে সেহরি খেয়েছেন স্টেশনের পাশের হোটেলে। আর রাতজুড়ে মুড়ি, বাদাম, চিপস তো চলেছেই।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে পুরো রাতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে সংবাদপত্র। রাত কাটাতে অনেকেই ভর করেছেন সংবাদপত্রের উপর। পড়াশেষে সেটি বিছিয়ে জিরিয়ে নিতেও দেখা গেছে অনেককে।
অপেক্ষার এই সময়টুকু কাটাতে অনেকেই বেছে নেন মজার সব খেলা। তাস, লুডু আর দাবা খেলার আসর জমে ওঠে। যারা খেলায় অংশ নেননি, তারা দর্শক হয়ে লুফে নিয়েছেন আনন্দটুকু।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মনিরুল ইসলাম নামে একজন বলেন, ‘লন্ডনে অলিম্পিক চলছে। এখানে তো আর দেখার মতো সুযোগ নেই। তাই চারপাশের খেলা দেখে অলিম্পিকের আমেজ উপভোগ করছি। সময়টাও কেটে যাচ্ছে বেশ।’
শ্যামলী থেকে ৫ তরুণ আইনজীবী এসেছেন দলবেঁধে। গোল হয়ে বসে তারাও মেতে উঠেছেন খেলায়। কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘বাসা থেকে একবারে রেডি হয়ে বের হয়েছি। সঙ্গে কোটও নিয়ে এসেছি। টিকিট কিনে সরাসরি আদালতে যাবো।’
ফুয়াদ, শোভন, সোহান, জয়ন্ত আর সনেটদের এই দলটি ঘিরেও অন্যদের আগ্রহের কমতি ছিল না।
স্টেশনে নারীদের জন্য ছিল ভিন্ন একটি সারি। টিকিটের জন্য এ সারির প্রথম দিকেই অপেক্ষা করছিলেন রুমা। তিনি বললেন, ‘কষ্টতো হয়েছে। তবে আমি একা নই বলে খারাপ লাগেনি। সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগবে টিকিটটি হাতে পাওয়ার পর।’
রুমা’র কথা ধরে রোখসানা বললেন, ‘আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই। তবে টিকিটি পেলে মনে হবে ৪০ লাখ টাকার লটারি পেয়েছি। সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দটুকু ভাগ করে নেওয়ার জন্যই এতোটা কষ্ট করছি।’
ভোরের আলো ফোটার খানিক আগে কয়েকটি কাউন্টারে আলো জ্বলে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে হইই...ই চিৎকারে ভরে উঠলো কমলাপুর স্টেশন। এই আওয়াজের সঙ্গে মিশে আছে একরাতের কষ্ট আর ঈদে স্বজনদের কাছে পাওয়ার আনন্দ। তবে ট্রেনের টিকিট আরও সহজলভ্য করতে পারলে এ কষ্ট কমে আসবে বলে মনে করছেন যাত্রীদের অনেকেই।
তাদের দাবি, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। টিকিট বিক্রি করতে স্টেশন ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ বুথ করা যেতে পারে। তাহলে এই সমস্যা অনেকটা কমে আসবে।
এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভীড়ও বাড়তে থাকে। কোনো কোনো কাউন্টারে সাড়ে ৫টা থেকে টিকিট দেওয়া শুরু করলেও বাকি কাউন্টারগুলোতে টিকিট পাওয়া যাবে ৯টার পর।
তবে যতক্ষণই লাগুক, টিকিট নিয়েই ঘরে ফিরবেন- এ প্রত্যাশায় কমলাপুর রেল স্টেশনে মানুষের সারি কেবলই দীর্ঘ হতে থাকে।
|
|
|
|